নতুন ল্যাপটপ কেনার পর করণীয়

কম্পিউটার বা ল্যাপটপ বর্তমানে একটি সহজলভ্য ডিজিটাল ডিভাইস‌। এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আমরা সবাই জানি।

দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন কাজে ল্যাপটপের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। ফ্রিল্যান্সিং যারা করেন বা বিভিন্ন ধরনের গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করেন তাদের জন্য একটি ভালো ল্যাপটপ বা কম্পিউটার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও শখের বশে ও অনেকে ল্যাপটপ ক্রয় করে থাকেন।

যারা নতুন ল্যাপটপ কিনেছেন তাদের মধ্যে অনেকেই জানে না কিভাবে এটি সেটআপ করতে হয় ও কিভাবে এর যত্ন নেয়া যায়। ল্যাপটপ কেনার আগে আমাদের যেমন ল্যাপটপ সম্পর্কে ধারণা রাখা জরুরি ঠিক তেমনি ল্যাপটপ কেনার পর এর যত্ন নেয়া এর চেয়েও অনেক বেশি জরুরি।  

অনেকে নতুন ল্যাপটপ কেনার পর সঠিক সেটিংস না করে নেয়ার কারণে কোনো না কোনো সমস্যা নিয়ে হাজির হয় সার্ভিসিং এর দোকানে। অথচ নতুন ল্যাপটপ কেনার পর সামান্য কিছু সেটিংস ঠিক করে নিলেই কিন্তু আর এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হয় না।

তাদের জন্যই আমার আজকের আর্টিকেল। একটু বুঝে নিলেই খুব সহজেই আপনি আপনার ল্যাপটপটি সেট আপ নিজেই করতে পারবেন।

চলুন ধাপে ধাপে জেনে নেয়া যাক নতুন ল্যাপটপ কেনার পর কি কি করতে হবে:

ল্যাপটপের সাথে প্রদত্ত বক্সটি ভালোভাবে চেক করতে হবে

প্রতিটি নতুন ল্যাপটপ এর সাথে বাক্স দেওয়া হয়, এতে ল্যাপটপের ওয়ারেন্টি তথ্য ও পাওয়ার কেবল থাকে। বক্সটি খুলে সব সবকিছু সেখানে সঠিকভাবে রয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করুন। সাবধানতার সাথে আপনার বাক্সের সামগ্রীগুলি বের করুন, যদি কোনও কিছু অনুপস্থিত থাকে, দ্রুত কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করতে হবে। 

পাওয়ার কানেক্টশন চেক করতে হবে

সেটআপ করার আগে আপনাকে পাওয়ার কানেকশন করতে হবে। পাওয়ার কেবল টি সংযুক্ত করে, ল্যাপটপের কর্নারে দেওয়া পাওয়ার সুইচ অন করতে হবে।

ল্যাপটপ টি চালু হবার পর এবং এটিকে বুট আপ করতে হবে। এবং আপনাকে একটি মাইক্রোসফ্ট অ্যাকাউন্ট তৈরি করতে হবে। ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা থাকলে ওয়াইফাই অথবা নেট কানেকশন করতে হবে। এরপর আপনাকে ল্যাপটপের সিস্টেম আপডেট করতে হবে এবং ল্যাপটপের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ডাউনলোড করতে হবে।

অপারেটিং সিস্টেম আপডেট করতে হবে

নতুন ল্যাপটপ কেনার পর প্রথম যে কাজটি করতে হবে তা হলো ল্যাপটপটির অপারেটিং সিস্টেম আপডেট করে নেয়া।

যেকোনো ল্যাপটপ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকে মার্কেটে আসার পর দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের জন্য ডিসপ্লে তে রাখা হয়। এর ফলে এর ভার্সনটি দূর্বল ও ব্যাকডেটেড হয়ে পড়ে।

এজন্য ল্যাপটপ কেনার পর পরই ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে এর অপারেটিং সিস্টেম আপডেট করে নিতে হবে। এর ফলে আপনি আপনার ল্যাপটপটিতে লেটেস্ট ফিচারগুলো পাবেন ও আপনার সিস্টেমকে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন।

সিস্টেমটি আপডেট করার সময় ডিভাইসটি কয়েকবার রিস্টার্ট নিতে পারে। এরপর চেক করে দেখতে হবে যে সব আপডেট ঠিক মতো হয়েছে কি না। না হলে আবার আপডেট করতে হবে।

সফটওয়্যার ইন্সটল করতে হবে

ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের প্রাণ হলো সফটওয়্যার। সফটওয়্যার ব্যবহার করেই ল্যাপটপের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করতে হয়। কিন্তু নতুনদের জন্য সফটওয়্যার ইন্সটল করা ঝামেলা মনে হতে পারে। এক্ষেত্রে “নিনাইট” নামক সফটওয়্যার ইন্সটল করা যেতে পারে।

এর মাধ্যমে এক ক্লিকের মাধ্যমেই বিভিন্ন ধরনের ফ্রি সফটওয়্যার ইন্সটল করা যায় অতি সহজেই।

এর মধ্যে অ্যান্টিভাইরাস ইউটিলিটি থেকে শুরু করে সব ধরনের প্রোগ্রাম পাওয়া যাবে।

“নিনাইট” ৩২ এবং ৬৪ বিট উভয় প্রকার সংস্করণের জন্য পাওয়া যায়।

এজন্য এটির ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে আপনার প্রয়োজনীয় সফটওয়্যারগুলো সিলেক্ট করে ডাউনলোড দিয়ে সেগুলো ইনস্টল করে নিতে পারবেন কোনো ঝামেলা ছাড়াই।

ঝামেলাবিহীন নিরাপদ ইনস্টল প্রক্রিয়ার জন্য বেস্ট হলো “নিনাইট”।

অবাঞ্চিত সফটওয়্যার রিমুভ করতে হবে

আপনার কেনা ল্যাপটপের অপারেটিং সিস্টেমে আগে থেকে বিভিন্ন ধরনের সফটওয়্যার ইন্সটল করা থাকতে পারে।কারণ ল্যাপটপ কোম্পানি এমন অনেক ধরনের সফটওয়্যার প্রিইন্সটল করে দেয় যা আসলে দরকার হয় না।

 এসব সফটওয়্যারকে ব্লোটওয়্যার বলা হয়।

এগুলো প্রায়শই অপ্রয়োজনীয় ও অকেজো হয়ে থাকে। এসব অবাঞ্ছিত সফটওয়্যার ড্রাইভের জায়গা দখল করে থাকে ও সিস্টেম রিসোর্স নষ্ট করে দেয়।

এজন্য এসব সফটওয়্যারকে রিমুভ করতে হবে।

এক্ষেত্রে স্টার্ট থেকে কন্ট্রোল প্যানেলে প্রবেশ করে অবাঞ্চিত সফটওয়্যারগুলো রিমুভ করে দিতে হবে।

ল্যাপটপের পাওয়ার সেটিংস অপটিমাইজ করতে হবে

ল্যাপটপ নেয়ার পর খেয়াল রাখতে হবে যেন এর পাওয়ার সেটিংস ড্যামেজড না হয়ে যায়।

এজন্য ল্যাপটপ কেনার পর পরই ল্যাপটপের পাওয়ার সেটিংস অপটিমাইজ করে নিতে হবে। এর ফলে ব্যাটারি লাইফ ভালো থাকে।

এক্ষেত্রে ল্যাপটপের স্ক্রিনের ব্রাইটনেস কমিয়ে রাখা জরুরি। এতে ব্যাটারি লাইফ অনেক ভালো থাকে। তবে চোখের সুবিধামতো ব্রাইটনেস কমিয়ে রাখতে হবে।

ড্রাইভারগুলো আপডেট করতে হবে

ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের ভালো পারফরমেন্স নির্ভর করে এর ড্রাইভারের ওপর। এই ড্রাইভারের মাধ্যমে ল্যাপটপের কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য এটাকে অবশ্যই আপডেট করতে হবে।

এটি আপডেট করার মাধ্যমে আপনার ল্যাপটপটির ড্রাইভ নানা রকম বাগ (ত্রুটি) থেকে সুরক্ষিত থাকবে।

এজন্য আপনার কেনা ল্যাপটপের মাদারবোর্ডের মডেল নম্বর অনুযায়ী ইন্টারনেটে সার্চ করে আপনার ল্যাপটপের ড্রাইভারের সর্বশেষ আপডেট সম্পর্কে জানতে পারবেন ও সেই অনুযায়ী আপডেট করে নিতে পারবেন।

এছাড়াও মাদারবোর্ডের কোম্পানির ওয়েবসাইটেও চোখ রাখতে হবে কোনো নতুন আপডেট এসেছে কি না তা জানার জন্য।

অ্যান্টিভাইরাস ইনস্টল করতে হবে

ল্যাপটপ কেনার পর অপারেটিং সিস্টেম আপডেট করে নেয়ার পর এবং সফটওয়্যার সেটিংস ঠিক করে নেয়ার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ল্যাপটপে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ইন্সটল করা।

কারণ ল্যাপটপে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে হয় ও বিভিন্ন কিছু ডাউনলোড ও আপলোড করতে হয়। এসব কাজ করার ফলে ল্যাপটপের অপারেটিং সিস্টেমে ভাইরাস প্রবেশ করতে পারে।

আর ভাইরাস কী কী করতে পারে তা আমরা সবাই জানি। তাই ভাইরাস যেনো আপনার নতুন ল্যাপটপে সহজেই প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

এজন্য ভালো অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ইন্সটল করে নিতে হবে। 

নিম্নে কয়েকটি অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারের নাম দেয়া হলো:

  1. Kaspersky Internet Security
  2. Quick Heal Total Security
  3. Quick Heal Internet Security
  4. Guardian Internet Security by Quick Heal

এসব অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার ইন্সটল করে রাখলে আপনার ল্যাপটপ থাকবে নিরাপদ ও সুরক্ষিত।

অ্যান্টি-থিফ টুল কনফিগার করে নিতে হবে

আপনি একটি ল্যাপটপ কিনেছেন এজন্য আপনার শখের ল্যাপটপটি অবশ্যই অতি যত্নের সহিত রাখতে হবে। কিন্তু সেটি যদি দূর্ভাগ্যক্রমে হারিয়ে যায় তখন কি হবে?

ডিভাইস হারিয়ে যাবে সেটি বড় কথা না তবে সেই ল্যাপটপের মধ্যে যে আপনার তথ্য বা পার্সোনাল ডেটা থাকবে সেটিও হারিয়ে যাবে।

যার কারণে আপনি বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারেন।

এই সমস্যা এড়াতে আপনার ল্যাপটপে একটি সিস্টেম চালু করে রাখতে হবে।

উইন্ডোজ ১০ এ “ফাইন্ড মাই ডিভাইস” নামক একটি অপশন রয়েছে। এটি অবশ্যই অন করে রাখতে হবে।

এর মাধ্যমে আপনার ল্যাপটপের মাইক্রোসফট একাউন্টের মাধ্যমে আপনি আপনার ল্যাপটপটি

শনাক্ত করে খুঁজে পেতে পারেন।

অটোমেটিক ব্যাকআপ কনফিগার করতে হবে

ল্যাপটপ দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের কারণে আপনার ল্যাপটপের স্টোরেজে বিভিন্ন ধরনের ডাটা জমা হতে থাকে যা স্টোরেজ ফুল করে দেয়।

একারণে অনেক ডেটার প্রেসারে যদি আপনার ল্যাপটপ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়,, তখন কি করবেন?

তখন হয়তো আপনার ল্যাপটপে জমা থাকা সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ডেটা ডিলিট হয়ে যেতে পারে। যা মোটেও ভালো কথা নয়।

এজন্য আপনার ল্যাপটপের ডাটা সুরক্ষিত করে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।

আর এটি করার জন্য আপনার ল্যাপটপে একটি ব্যাকআপ প্ল্যান সেট আপ করে রাখতে হবে।

এতে করে আপনার ল্যাপটপ যদি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় তবেও আপনার জমা করা তথ্যগুলো হারিয়ে যাবে না। সেগুলো ব্যাকআপ হিসেবে জমা হয়ে থাকবে এবং পরবর্তীতে আপনি তা ফিরে পাবেন।

ক্লাউড স্টোরেজ সেটআপ করতে হবে

ল্যাপটপ কেনার পর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ক্লাউড স্টোরেজ সেটআপ করা।

এটি করলে আপনি আপনার ল্যাপটপের মাধ্যমে অতি সহজেই যেকোনো ডিভাইস থেকে যেকোনো সময়ে বিভিন্ন ধরনের ফাইল এক্সেস করতে পারবেন কোনো ঝামেলা ছাড়াই।

পরিশেষে বলা যায়,

ল্যাপটপ বা কম্পিউটার আমাদের অতি প্রয়োজনীয় ও শখের জিনিস।

তাই এটি যেন দীর্ঘদিন ব্যবহার করা যায় সেই ব্যবস্থাই করতে হবে।

আর এজন্য উপরে বর্ণিত নিয়মাবলী অনুসরণ করতে হবে। তবেই আপনার শখের ল্যাপটপটি আপনি দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারবেন।

আশা করি উপরোক্ত তথ্যাবলির মাধ্যমে পাঠক বৃন্দরা উপকৃত হবেন ও বুঝতে পারবেন কিভাবে আপনি আপনার নতুন ল্যাপটপটি যত্ন সহকারে রাখতে পারবেন।

Leave a Comment